কুরআনের আয়াত কি বিলুপ্ত হতে পারে? (নাসখ ও মানসূখ)
নাসখ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো— অপসারণ করা, বাতিল করা, দূর করা; স্থানান্তর করা, পরিবর্তন করা, রূপান্তর করা। পরিভাষায় নাসখ বলতে বোঝায়, কোনো শরয়ি বিধানকে পরবর্তীকালে আগত অন্য একটি শরয়ি দলিলের মাধ্যমে রহিত করে দেওয়া। যে ক্ষেত্রে নাসখ সংঘটিত হয়, সেখানে পূর্ববর্তী বিধানকে মানসূখ এবং যে নতুন বিধান বা দলিল পূর্বের বিধানকে কার্যকারিতা থেকে সরিয়ে দেয় তাকে নাসিখ বলা হয়।
বিশেষত ফিকহের উসূলবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকৃত অর্থে নাসখকারী একমাত্র আল্লাহ। তাই কোনো দলিল বা বিধানকে নাসিখ বলা প্রকৃত অর্থে নয়, বরং রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, যারা মুহকাম শব্দের অর্থ “যা রহিত হয়নি” বলে ব্যাখ্যা করেন, তাদের মতে নাসিখসহ যেসব আয়াতের বিধান রহিত হয়নি, সেগুলোই মুহকাম।
নাসখ সংঘটিত হওয়ার জন্য কয়েকটি সাধারণ শর্ত রয়েছে। যেমন—
- তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সংঘটিত হতে পারবে না।
- নাসিখ ও মানসূখ উভয়ই শরয়ি (কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক) আমলি বিধান হতে হবে।
- মানসূখ বিধানটি কিছু সময়ের জন্য কার্যকর ছিল—এটি প্রমাণিত হতে হবে।
- দুই বিধানের মধ্যে এমন প্রকৃত বিরোধ থাকতে হবে, যাতে উভয়ের ওপর একসঙ্গে আমল করা সম্ভব না হয়।
- নাসিখ বিধানের দলিল মানসূখ বিধানের দলিলের সমপর্যায়ের অথবা তার চেয়ে অধিক শক্তিশালী হতে হবে।
কুরআনের আহ্বান যে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য—এ কথা প্রথম অবতীর্ণ আয়াতসমূহ থেকেই জোর দিয়ে বলা হয়েছে (যেমন: সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৮, আল-আম্বিয়া ২১:১০৭, আল-ফুরকান ২৫:১, সাবা ৩৪:২৮, আত-তাকভীর ৮১:২৭)। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (সা.) নবীদের সর্বশেষ (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪০), আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন ইসলাম (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯), এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম অনুসরণ করলে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)।
ইসলামী পণ্ডিতগণ এ বিষয়ে একমত যে, ইসলাম পূর্ববর্তী শরিয়তসমূহকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে রহিত করেছে। নবীদের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সব ঐশী ধর্ম আকিদা, নৈতিকতা ও ইবাদতের মৌলিক নীতিতে অভিন্ন ছিল; পার্থক্য ছিল মূলত কিছু আমলি বিধানে।
ইহুদি সম্প্রদায়ের কিছু গোষ্ঠী নাসখকে অস্বীকার করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, নাসখ মেনে নিলে আল্লাহর জ্ঞানে পরিবর্তন (বাদা’) ঘটেছে—এমন ধারণা জন্ম নেবে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু খ্রিস্টান চিন্তাবিদও অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মানবজাতির ঐতিহাসিক বিকাশ বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, মানুষের অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ঐশী বিধানের আমলি দিকে কিছু পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। এটিকে আল্লাহর জ্ঞানে পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে করা সম্পূর্ণ ভুল।
ইসলামের পূর্ববর্তী ঐশী ধর্মগুলোতেও নাসখের বহু উদাহরণ রয়েছে। যেমন—
- হযরত আদম (আ.)-এর সময় তাঁর পুত্র-কন্যাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাহ বৈধ ছিল; কিন্তু পরে তাওরাতে তা হারাম ঘোষণা করা হয় (লেবীয় পুস্তক ১৮:৯, ২০:১৭; দ্বিতীয় বিবরণ ২৭:২২)।
- হযরত নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের জন্য রক্তযুক্ত মাংস ব্যতীত সব প্রাণী ভক্ষণ বৈধ ছিল (আদিপুস্তক ৯:২–৪); কিন্তু হযরত মূসা (আ.)-এর শরিয়তে কিছু প্রাণী হারাম করা হয় (লেবীয় পুস্তক ১১; দ্বিতীয় বিবরণ ১৪:৩–৮; তুলনা করুন: সূরা আল-আন‘আম ৬:১৪৬)।
- ইহুদি শরিয়তে স্বামী স্ত্রীর তালাক দেওয়া বৈধ ছিল (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১–৩); কিন্তু খ্রিস্টধর্মে স্ত্রীর ব্যভিচার ব্যতীত অন্য কোনো কারণে তালাক নিষিদ্ধ করা হয় (মথি ৫:৩১–৩২)।
এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে, নাসখ ইসলামের পূর্ববর্তী ঐশী ধর্মগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।
যদিও নাসখ ধারণাটি পবিত্র কুরআনে (সূরা আল-বাকারা ২:১০৬) এবং হাদিসেও উল্লেখ হয়েছে, তথাপি মাযহাবের ইমামদের যুগ পর্যন্ত এ পরিভাষার সুনির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ নিয়ে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা দেখা যায় না।
নাসখকে স্বীকারকারী সকল আলেম এ বিষয়ে একমত যে, কুরআন কুরআনের কোনো বিধানকে এবং সুন্নাহ সুন্নাহর কোনো বিধানকে রহিত (নাসখ) করতে পারে। তবে কুরআন সুন্নাহকে অথবা সুন্নাহ কুরআনকে নাসখ করতে পারে কি না—এ বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-সহ যেসব আলেম সুন্নাহর প্রধান কাজকে কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান বলে মনে করেন, তারা এ ধরনের নাসখের বিরোধিতা করেছেন। পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেমের মতে, কুরআন যেমন সুন্নাহকে নাসখ করতে পারে, তেমনি মুতাওয়াতির সুন্নাহও কুরআনের কোনো বিধানকে নাসখ করতে পারে।
কুরআনের মাধ্যমে সুন্নাহ নাসখ হওয়ার উদাহরণ হিসেবে সাধারণত দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়—
- কিবলা বায়তুল মাকদিস (মসজিদুল আকসা) থেকে কাবামুখী করে দেওয়া (সূরা আল-বাকারা ২:১৪৪; সহিহ বুখারি, তাফসির; সহিহ মুসলিম, মাসাজিদ)।
- আশুরার রোজার বাধ্যবাধকতা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার মাধ্যমে রহিত হওয়া (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫; সহিহ বুখারি, সাওম; সহিহ মুসলিম, সিয়াম)।
অন্যদিকে, যারা এ মতের বিরোধিতা করেন, তারা এই দুটি ঘটনাকে কুরআনের মাধ্যমে ইহুদি শরিয়তের বিধান রহিত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন; সুন্নাহ নাসখ হওয়ার উদাহরণ হিসেবে নয়।
ইসলামের প্রথম যুগগুলোতে কুরআনের মধ্যে নাসখের অস্তিত্ব প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু হিজরি চতুর্থ (খ্রিস্টীয় দশম) শতাব্দীর প্রথম ভাগে মৃত্যুবরণকারী মু’তাযিলা আলেম আবু মুসলিম আল-ইসফাহানী এ মতের বিরোধিতা করার পর বিষয়টি ব্যাপক বিতর্কের রূপ নেয়।
নাসখ স্বীকারকারী আলেমদের মতে, নাসখ যেমন এক ঐশী শরিয়ত থেকে অন্য শরিয়তের মধ্যে সংঘটিত হতে পারে, তেমনি একই শরিয়তের মধ্যেও ঘটতে পারে। কারণ মানুষ বহুদিন ধরে লালিত বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও সামাজিক প্রথা এক মুহূর্তে ত্যাগ করে নতুন ধর্মের বিধান গ্রহণ করতে পারে না। বরং যখন মানুষ প্রথমে দ্বীনের মর্ম, তার বিধান ও নীতিমালার মহত্ত্ব উপলব্ধি করে গ্রহণ করে, তখন তার জন্য ব্যবহারিক বিধানগুলো মেনে নেওয়া সহজ হয়। এ কারণেই এসব বিধান একসঙ্গে নয়, বরং ধাপে ধাপে (তাদরীজ বা ক্রমান্বয়ে) অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং ওহি নাজিলের সময়কালে কুরআনের অল্পসংখ্যক ব্যবহারিক বিধানে পরিবর্তন হওয়াকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।
কুরআনে নাসখের অস্তিত্বে বিশ্বাসী আলেমরা তাদের মতের সমর্থনে যুক্তিগত ব্যাখ্যার পাশাপাশি তিনটি আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন (নাজিলের ক্রমানুসারে):
- সূরা আন-নাহল ১৬:১০১
- সূরা আর-রা’দ ১৩:৩৯
- সূরা আল-বাকারা ২:১০৬
অপরদিকে আবু মুসলিম আল-ইসফাহানী সূরা ফুসসিলাতের সেই আয়াতের (৪১:৪২) ওপর নির্ভর করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, কুরআনের কাছে সামনে বা পেছন থেকে কোনো বাতিল আসতে পারে না। তাঁর মতে, কুরআনে নাসখ স্বীকার করলে তার অর্থ হবে কুরআনের কোনো বিধান বাতিল হয়ে গেছে, যা উক্ত আয়াতের পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, নাসখের প্রমাণ হিসেবে যেসব আয়াত উল্লেখ করা হয়, সেগুলোর উদ্দেশ্য কুরআনের নিজস্ব বিধান রহিত হওয়া নয়; বরং পূর্ববর্তী শরিয়তের কিছু বিধান রহিত হওয়া, অথবা কিবলাকে জেরুজালেম (বায়তুল মাকদিস) থেকে মসজিদুল হারামের দিকে পরিবর্তন করার মতো ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে।
যদিও আবু মুসলিমের এ মতামত সমালোচিত হয়েছে, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীর সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মতের প্রবক্তারা চেষ্টা করেছেন নাসিখ ও মানসূখ বলে পরিচিত আয়াতগুলোর মধ্যে প্রকৃতপক্ষে নাসখ নেই—এটি প্রমাণ করার জন্য। এ উদ্দেশ্যে তারা তাখসিস (সাধারণ বিধানকে বিশেষায়িত করা) ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে আয়াতগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেও, কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকে জোরপূর্বক ও দূরবর্তী ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ক্লাসিক ইসলামী গ্রন্থসমূহ অনুযায়ী মানসূখ (যে বিধান রহিত হয়েছে) তিন প্রকার:
১. যে আয়াতের পাঠ (নাযম) ও বিধান—উভয়ই রহিত হয়েছে
সালাফ থেকে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়েতে উল্লেখ রয়েছে যে, কুরআনের কিছু আয়াত বা এমনকি কিছু সূরা পরবর্তীকালে তুলে নেওয়া হয়েছে অথবা মানুষের স্মৃতি থেকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে (যেমন: সহিহ বুখারি, রিকাক; সহিহ মুসলিম, যাকাত; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক)।
হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস অনুযায়ী, প্রথমে এমন একটি আয়াত নাজিল হয়েছিল যাতে দশবার স্তন্যপান করলে দুধ-সম্পর্ক (রিদা‘আত) প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিবাহ হারাম হবে। পরে এ বিধান পাঁচবার স্তন্যপান-এর মাধ্যমে রহিত করা হয় (সহিহ মুসলিম, রিদা‘আত; ইবন মাজাহ, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ)।
বর্তমান মুসহাফে দশবার স্তন্যপান-সংক্রান্ত আয়াতের পাঠ (লফজ) নেই; একই সঙ্গে তার বিধানও কার্যকারিতা হারিয়েছে। তাই এটিকে এমন নাসখের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেখানে পাঠ ও বিধান—উভয়ই রহিত হয়েছে।
২. যে আয়াতের পাঠ (নাযম) রহিত হয়েছে, কিন্তু বিধান বহাল রয়েছে
কিছু আলেম এ ধরনের নাসখ স্বীকার করেননি। তাদের যুক্তি হলো, এ বিষয়ে যে বর্ণনাগুলো এসেছে, সেগুলো খবরে ওয়াহিদ (একক সূত্রে বর্ণিত হাদিস)। অথচ কুরআনে নাসখের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এমন বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হতে পারে না (যারকাশী, আল-বুরহান, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬)।
অন্যদিকে, যারা এ ধরনের নাসখ গ্রহণ করেন, তারা বলেন যে, আয়াতের পাঠ (লফজ) এক বিষয়, আর সেই পাঠ থেকে প্রাপ্ত শরয়ি বিধান আরেক বিষয়। ফলে পাঠ রহিত হলেও বিধান বহাল থাকতে পারে (গাজ্জালী, আল-মুস্তাসফা, খণ্ড ২, পৃ. ৯৬)।
এ ধরনের নাসখের উদাহরণ হিসেবে সাধারণত “রজমের আয়াত” নামে পরিচিত একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়, যার অর্থ:
“বৃদ্ধ (অর্থাৎ বিবাহিত) পুরুষ ও বৃদ্ধা (বিবাহিতা) নারী যখন ব্যভিচার করবে, তখন তাদের রজম করো…”
(সহিহ বুখারি, হুদুদ, ই‘তিসাম; সহিহ মুসলিম, হুদুদ)
উবাই ইবন কা‘ব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এই আয়াতের পাঠ রহিত হওয়ার আগে এটি সূরা আহযাব-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল (হাকিম, আল-মুস্তাদরাক)।
৩. যে আয়াতের বিধান রহিত হয়েছে, কিন্তু পাঠ (নাযম) বহাল রয়েছে
কুরআনে নাসখ স্বীকারকারী অধিকাংশ আলেমের মতে এটাই নাসখের প্রধান ও প্রকৃত ধরন। নাসখ বিষয়ক অধিকাংশ গ্রন্থের মূল আলোচনাও এ বিষয়কে কেন্দ্র করে।
সালাফ থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত এবং প্রাথমিক যুগে রচিত গ্রন্থগুলোতে এমন আয়াতের সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলা হয়েছে, যেগুলোর পাঠ বিদ্যমান থাকলেও বিধান রহিত হয়েছে (মুস্তফা যায়েদ, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৭–৪০৮)।
তবে এর একটি কারণ ছিল, প্রাথমিক যুগের আলেমরা “নাসখ” শব্দটিকে পরবর্তী যুগের উসূলবিদদের তুলনায় অনেক বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করতেন। এছাড়া কিছু আলেম নাসখ নির্ধারণে অতিরঞ্জনেরও আশ্রয় নিয়েছিলেন।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো—মাক্কী সূরাগুলোতে যেসব আয়াতে মুশরিকদের নির্যাতনের প্রতি ধৈর্য ধারণ করতে, তাদের উপেক্ষা করতে এবং সংঘর্ষে না জড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে পরবর্তীকালে যুদ্ধের নির্দেশবাহী আয়াত—
“অতঃপর হারাম মাসসমূহ অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর…” (সূরা আত-তাওবা ৯:৫)
—এর মাধ্যমে রহিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
কিছু আলেমের মতে, এই একটি আয়াত ১১৪ বা ১২৪টি আয়াতের বিধান রহিত করেছে।
কিন্তু উসূলুল ফিকহ ও তাফসিরবিদদের অধিকাংশের মতে, সূরা তাওবার এই আয়াত এবং যেসব আয়াতকে এর দ্বারা মানসূখ বলা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই সেগুলোকে নাসখের উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা সঠিক নয়।
ইমাম শাফেয়ী ও মুহাম্মাদ ইবন জারীর আত-তাবারীর মতো আলেমদের নেতৃত্বে নাসখকে তাখসিস (সাধারণ বিধানকে বিশেষায়িত করা), তাকয়ীদ (শর্ত আরোপ), অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ইত্যাদি ধারণা থেকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে নাসখ ছিল না, সেসব দাবিও পর্যালোচনা করে বর্জন করা হয়।
এর ফলে মানসূখ আয়াতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
ইমাম সুয়ূতী তাঁর সময় পর্যন্ত রচিত গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে মানসূখ আয়াতের সংখ্যা মাত্র ২০টি বলে উল্লেখ করেন (আল-ইতকান, খণ্ড ৩, পৃ. ৬৫–৬৮)। পরবর্তীতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী এ ২০টির মধ্য থেকেও মাত্র ৫টি আয়াতকে প্রকৃত অর্থে মানসূখ বলে অভিহিত করেন।
ইসলামী আলেমগণ কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে নাসখ সংঘটিত হয়েছে কি না—এই বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন।
তাদের মতে, নিম্নোক্ত অবস্থাগুলোর কোনো একটি বিদ্যমান থাকলে কোনো আয়াতের নাসখ সংঘটিত হয়েছে বলে গ্রহণ করা যেতে পারে—
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বা কোনো সাহাবি থেকে নির্ভরযোগ্য (সহিহ) সূত্রে স্পষ্টভাবে বর্ণিত থাকতে হবে যে, একটি নির্দিষ্ট আয়াত অন্য একটি আয়াত দ্বারা রহিত (মানসূখ) হয়েছে।
- নাসিখ আয়াতের মধ্যেই পূর্ববর্তী বিধান রহিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী শব্দ বা বাক্য থাকতে হবে। যেমন, সূরা আল-আনফাল (৮:৬৬) এবং সূরা আল-মুজাদিলা (৫৮:১৩)-এর সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহে পূর্ববর্তী বিধান প্রত্যাহার করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- বাহ্যিকভাবে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হওয়া দুটি আয়াতের ক্ষেত্রে যদি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে, একটি আয়াত অপরটির পরে নাজিল হয়েছে, তাহলে পরবর্তীকালে অবতীর্ণ আয়াতটিকে পূর্ববর্তী আয়াতের নাসিখ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
ইসলামী আলেমদের মতে, এ ধরনের প্রমাণ ও শর্ত পূরণ হলে তবেই কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে নাসখ সংঘটিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন।






